English | Bangla
জলাধারগুলো রক্ষা করতে হবে
বিশ্বের প্রায় অর্ধেকটা জনগোষ্ঠী এখন নগরে বাস করছে। দ্রুত নগরায়নের এই ধাক্কা লেগেছে বাংলাদেশেও। দেশের ছাব্বিশ ভাগ মানুষ এই নগরের বাসিন্দা, যার মধ্যে ৪০ ভাগই রাজধানী ঢাকার অধিবাসী। সে অনুসারে বাড়তি জনসংখ্যার কথা মাথায় রেখে যথাযথ পরিকল্পনা নেই। এতে নাগরিক সুযোগ-সুবিধা প্রতিনিয়ত ছোট হয়ে আসছে। আবাসন, যাতায়াত, পানি, বিদ্যুত, বিনোদনসহ নানা সঙ্কটে ঢাকাবাসীর দৈনন্দিন জীবনে দম বেরুনোর জোগাড় হয়েছে। এ সব সঙ্কট নিরসনে এখনই পরিকল্পিত উদ্যোগ নিতে হবে। নাহলে ঢাকা একটি পরিত্যক্ত নগরে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই একটি বসবাসের উপযোগী নগর হিসেবে ঢাকাকে গড়ে তুলতে জলাধার এবং উন্মুক্ত স্থানের সুরক্ষা অপরিহার্য।
 
নগর মানেই ইট-কাঠ-কংক্রিট আর যন্ত্রের সমাহার নয়। নগরে থাকবে এক সুষম কাঠমো, বিন্যাস। এতে ব্যস্ত নাগরিক জীবনে লোকজনকে একটু প্রাণের ছোঁয়া পেতে খোরাক জোগাবে। জলাধার ও উন্মুক্ত স্থান সেই কাঙ্ক্ষিত জীবন বাস্তবে এনে দিতে অত্যাবশ্যকীয় উপাদান। কিন্তু তথাকথিত উন্নয়নের নামে শুধু সারি সারি ভবন ও রাস্তাঘাট নির্মিত হচ্ছে। এসব কিছু হচ্ছে পুরোপুরি অপরিকল্পিতভাবে। তাই এগুলো জলাধার ও উন্মূক্ত জায়গা গিলে খাচ্ছে। যার খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। এই ব্যবস্থার অবসান করতে হবে, গড়ে তুলতে হবে একটি মানবিক, বৈষম্যহীন নাগরিক সুবিধা সম্বলিত নগরী। সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে জলাধার ও উন্মূক্ত স্থান সংরক্ষণ  করতে হবে। এই নগরী আমাদের সকলের, একে বসবাসযোগ্য করতে সবাইকে নিজস্ব অবস্থান থেকে কাজ করতে হবে।
 
 
জলাধারগুলো রক্ষা করতে হবে মানুষের জীবনের জন্য পানির কোন বিকল্প নেই। ঢাকা শহরের পানি সমস্যা নিয়ে নতুন করে বক্তব্য দেয়ার কোন প্রয়োজন নেই, কারণ ভুক্তভোগী আমরা সবাই। ঢাকা শহরের বর্তমানে পানির ঘাটতি অর্ধশত কোটি লিটার। পানির চাহিদা ২২০ কোটি লিটার হলেও উত্তোলন হয় ১৭০ কোটি লিটার। ঢাকা ওয়াসা সরবারহকৃত পানির ১৩ ভাগ নদীর এবং ৮৭ ভাগ নলকুপের। আশঙ্কার বিষয় হলো, ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর প্রতিনিয়ত নেমে যাচ্ছে। পরবর্তী পাঁচ বছর পর ঢাকার পানি সঙ্কট আরও প্রচণ্ড হবে। বাড়তি ভুগর্ভস্থ পানি উত্তোলন ঢাকায় ভূমিধ্বসের ঝুঁকিসহ পরিবেশকে নানা হুমকির মুখোমুখি করছে। অচিরেই ভূ-গর্ভস্থ স্থর থেকে পানি উত্তোলন কঠিন হয়ে পড়বে। বর্তমানে শহরের সত্তর ভাগ দরিদ্র মানুষের বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা নেই। অপরদিকে নিরাপদ পানির অভাবে দেশে লাখেরও বেশি লোক মারা যাচ্ছে। নিরাপদ পানি নিশ্চিত হলে বাঁচবে সাত হাজার কোটি টাকা। যেখানে দেশের বেশিরভাগ পানির উৎস জলাধার, সেখানে এগুলোকে রক্ষা করতে না পারলে এই বিপুল জনগোষ্ঠীর পানির সঙ্কট নিরসনও অসম্ভব হবে। তাই যে কোন মূল্যে জলাধারগুলো রক্ষা করতে হবে।
 
জলাধার ধ্বংস করায় আমাদের সমস্যা দুই দিক থেকে হচ্ছে। এরমধ্যে নিত্যদিনের পানি সঙ্কট তো আছেই। বর্ষা মৌসুমেও পানি নিষ্কাশনের অভাবে জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। ২০০৯ সালে ৯ ঘন্টার তিনশ’ ৩৩ মিলিমিটার বৃষ্টিতে তলিয়ে যায় এই নগর। প্রতিবছর ভরা বর্ষায় ৬ ঘন্টায় ১৫০ মিলিমিটার বা তারও বেশি বৃষ্টি হয়। তখন সে পরিমান পানি নিষ্কাশন করা বর্তমান ড্রেনেজ ব্যবস্থায় অসম্ভব। জলাবদ্ধতার কারণে মানুষ চলাচলসহ নানা সমস্যা মোকাবেলা করছে।  
 
পানির সমস্যা ও জলাবদ্ধতা এই দুটি আমাদের দৃশ্যমান সমস্যা। জলাধারগুলো আমাদের মৎস্য সম্পদের একটি বড় আধার। কিন্তু ঢাকার মতো এই বৃহৎ শহরের জলাধারা না থাকায় এ শহরের নিজস্ব মৎস্য সম্পদের ভান্ডার শূন্য। নূন্যতম চাহিদা মেটানোর ব্যবস্থাও নেই। জলাধারগুলো না থাকলে পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠবে। ধ্বংশ হবে জীববৈচিত্র। কেননা জলাধারগুলোয় মাছ আর নানা প্রজাতির জীব থাকে। তাই জলাধার ভরাটের সাথে সাথে সেই জীববৈচিত্রও ধ্বংস হয়েছে।বিনোদনের অন্যতম ক্ষেত্রও হতে পারত জলাধার । ধানমন্ডি লেক, হাতিরঝিল উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। আর ঢাকা শহরের খালগুলো উদ্বার হলে, এ নগরে একটি আদর্শ নৌযোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।
 
দখল হয়ে যাওয়া জলাধার ভৌগলিক কারণেই ঢাকা নগরী জলাধারের জন্য অত্যন্ত সমৃদ্ধ। ঢাকার চারপাশ বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষা, বালু ও তুরাগ এই চার নদী বেষ্টিত। এছাড়াও ঢাকার অভ্যন্তরেও রয়েছে ছোট বড় অসংখ্য খাল, পুকুর। ঢাকা ওয়াসার হিসেব মতে, একসময় ঢাকায় ৪৭টি খাল ছিল। কিন্তু সংরক্ষণের অভাবে আজ মাত্র ২৬টি খালের হিসেব পাওয়া যায়। সরকারি এবং বেসরকারি উদ্যোগে খালগুলিকে হত্যা করা হয়েছে।
 
জলাবদ্ধতা নিরসনের মূল দায়িত্ব ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের। অথচ ডিসিসি খালগুলো সংরক্ষণের পরিবর্তে দখল করে উনিশটি রাস্তা নির্মাণ করেছে। ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নয়নের নামে অনেক রাস্তার উপর বক্স কালভার্ট নির্মাণ করা হয়েছে। তার নিচের যে খালগুলো রয়েছে, সেগুনবাগিচা খাল অন্যতম। অপরদিকে বর্তমানে খালগুলো উদ্ধারের নামে যে, কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়েছে তাও সুখকর নয়। সুরক্ষার নাম খালগুলো দুই পাশ বাধাই করা হচ্ছে। খালের দুই ধার বাধাই করে খালকে রক্ষা করা নামান্তরে খাল ড্রেনে পরিণত হচ্ছে। খালের জীববৈচিত্র ও পরিবেশ ধ্বংশ হচ্ছে। কল্যাণপুর লেক তার একটি প্রকৃত উদাহরণ। ঢাকায় ১৯৮৪ ও ১৯৮৫ সালে পুকুরের সংখ্যা ছিল ২ হাজার এবং ১৯৮৮ ও ১৯৮৯ সালে তা কমে দাড়ায় এক হাজার দুইশতে। ডিসিসি সুত্র অনুসারে, তাদের ১০ টি অঞ্চলে মোট পুকুর ও ঝিলের পরিমাণ ৫ হাজার ১শ ৪২ বিঘা। বর্তমানে ঢাকার পুকুর হতে গোনা এবং যে কয়েকটি পুকুর আছে তার অস্তিত্বও সঙ্কটে।
 
পুরান ঢাকার সিক্কাটুলিতে একটি পুকুর রয়েছে, যা ওই এলাকার একমাত্র পুকুর। কিন্তু এ পুকুরটি দখলের পায়তারা চলছে। এলাকাবাসী আর পরিবেশবিদরা অব্যাহত আন্দোলন বজায় রেখেছে। জলাধার রক্ষায় এত আলোড়নের পরও পুকুরটি রক্ষায় সরকারি সংস্থার উদ্যোগ হতাশাব্যঞ্চক। বর্তমানে এত আলোড়নের পরও নদী ও জলাধার রক্ষার কোন চেষ্টা নেই। বিভিন্ন ভাবে জলাধারগুলো দখল ও ধ্বংস করা হচ্ছে। প্রায় সাত হাজার দখলদারের কব্জায় ঢাকার নদীপাড়ের বিপুর অংশ।
 
দখল ও ভরাট করে জলাধারের দখল চলছে। কেবল পেশীশক্তি দিয়েই দখল করা হচ্ছে না, বর্জ্য ফেলেও ভারাট করা হচ্ছে নদী। বুড়িগঙ্গায় যে পরিমান বর্জ্য ফেলা হয়েছে, তার এক কিলোমিটারের বর্জ্য রাখতে একুশ একর জমি লাগবে। অপর দিকে পরিকল্পিতভাবে ব্রিজ বা কলাভার্ট নির্মাণ করে জলাধারগুলোর পানি প্রবাহ ও নৌপথ রোধ করা হচ্ছে। যেমন রাজধানী চারপাশে বৃত্তাকার নৌপথের বড় বাধা ১৪টি সেতু।
 
সম্প্রতি খাল ভরাট করে নির্মাণ করা হচ্ছে পুর্বাচলগামী তিনশ ফুট রাস্তা। এ রাস্তার কারণে ৩০ ফুট ডুমুরি খালের অস্তিত্ব আজ সঙ্কটে। নদীগুলীও নির্মম অবহেলা আর যতেচ্ছা ব্যবহারের শিকার। সরকার জলাধার রক্ষায় বেশি আন্তরিক, এ নিয়ে সন্দেহ নেই। এমনকি বিচার বিভাগ থেকেও বেশকিছু যুগান্তকারী দিক-নির্দেশনামূলক সিদ্ধান্ত এসেছে। এতে জনমনে আশার সঞ্চার হয়েছে। কিন্তু তারপরও একটি অশুভ চক্রের অপতৎপরতা রোধ করা রীতিমত চ্যালেঞ্জ হয়ে দাড়িয়েছে। এদের মোকাবিলার মধ্য দিয়ে অবশিষ্ট সুবিধাটুকু জনসাধারণের কাছে পৌঁছে দিতে সরকারের সকল শুভ উদ্যোগকে আমরা সাধুবাদ জানাই। এরই সাথে ঢাকার বুকে রমনা, সোহরাওয়ার্দী, ধানমন্ডি লেকসহ ছোট বড় অসংখ্য উন্মুক্ত স্থান রয়েছে। সেগুলি রক্ষাকল্পে সরকারের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ও তার যথাযথ বাস্তবায়ন প্রত্যাশা করছি।