English | Bangla
নারীর গৃহস্থালী কাজের স্বীকৃতি
মানবিক ও সামাজিক কার্যক্রমকে বাজার অর্থনীতির যুগে অনেকেই অকাজ বলে মন্তব্য করেন। যদি কোন পেশাজীবী যেমন চিকিৎসক, আইনজীবী, শিক্ষক বা অন্য যে কোন পেশার মানুষ বিনামূল্যে কাজ করেন, তখন মন্তব্য হয় মানুষটার পাগলামি  পেয়েছে। যে সকল নারী সংসার সামলান, তাদের স্বামীকে যদি প্রশ্ন করা হয়, আপনার স্ত্রী কি করেন? উত্তরে অনেকেই বলেন কিছু করে না, সংসার সামলান। সংসারের দায়িত্ব পালন একটি মানবিক দায়িত্ব সম্পন্ন অবদান, তা অনেকেই অনুধাবন করি না। সামজের মানসিকতা হয়ে দাড়িয়েছে, কাজ তখনই গণ্য হবে যদি তা হতে অর্থ আয় হয়। 
 
গৃহস্থালী কাজে নারীদের  অমূল্য শ্রমের কারণেই যুগ যুগ ধরে টিকে রয়েছে আমাদের পরিবার বা সামাজিক অবকাঠামো। তবে এসব কাজের বিনিময়ে কোন পারিশ্রমিক বা নগদ অর্থ দেয়া হয় না বলে, এগুলোকে মূল্যহীন বা অদৃশ্য কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়। নারীর গৃহস্থালী কাজকে অদৃশ্য গণনার সাথে সাথে নারীকেও মূল্যহীন ধরে নেয়া হয়। 
 
সুখী, সুন্দর পরিবার গড়তে নারী-পুরুষ উভয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে। তবে সময়ের সাথে সাথে জীবনের অধিকাংশ বিষয়কে অর্থ মূল্যে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। ফলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নগদ অর্থ উপার্জনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিকে পরিবারের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে গণ্য করা হয়। কেবলমাত্র অর্থ উপার্জনমূলক কর্মকান্ডকে প্রাধান্য দেয়ায় গৃহিনীদের গৃহস্থালী শ্রমকে গুরুত্বহীন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। একজন চাকুরীজীবি নারীকেও গৃহস্থালীর বেশির ভাগ কাজ সম্পন্ন করতে হয়। অর্থাৎ চাকুরীজীবি বা গৃহিণী সব নারীকেই গৃহস্থালীর কাজে সময় ও শ্রম দিতে হয়। কিন্তু এই দ্বিগুন শ্রমের সঠিক মূল্যায়ন হয় না।  নারীর গৃহস্থালী কাজের অবদানকে শুধু ব্যক্তি পর্যায়ে নয়, রাষ্ট্রীয়ভাবেও স্বীকৃতি প্রদান করা হয় না। 
 

বিশ্বের অধিকাংশ দেশের জিডিপি গণনার জন্য জাতিসংঘ প্রদত্ত জাতীয় হিসাব পদ্ধতি United Nation System of National Accounts (UNSNA) র নির্দেশনা  অনুসরণ করা হয়ে। UNSNA -র অনুযায়ী নারীরা কারখানা, খামার বা অফিসে যখন নগদ অর্থের বিনিময়ে কাজ করে, শুধু তখনই তাদের শ্রমকে Gross Domestic Product (GDP)র অন্তর্ভুক্ত হয়। ফলে পৃথিবীর অনেক দেশেই নারীর গৃহস্থালী কাজকে জাতীয় অর্থনীতিতে অর্ন্তভুক্ত করা হয় না। ভুটান বিশ্বের অন্যতম দেশ যারা ভিন্নভাবে দেশের অগ্রগতি পরিমাপ করে। Gross National Happiness (GNH) নামক এ পদ্ধতিতে নারীর গৃহস্থালী কাজের অবদানকে গননা ও স্বীকৃতি প্রদান করা হয়েছে। অর্থনীতিবিদ Marilyn Waring তাঁর If Women Counted: A New Feminist Economics শীর্ষক প্রকাশনায় জাতীয় অর্থনীতিতে নারীর গৃহস্থালী অবদানের স্বীকৃতির বিষয়টি গুরুত্বের সাথে তুলে ধরেন।

 
বাংলাদেশ জাতীয়ভাবে নারীর গৃহস্থালী অবদানের হিসাব না করা হলেও, বেসরকারী পর্যায়ে এ সংক্রান্ত কয়েকটি গবেষণা রয়েছে। জাতীয় অর্থনীতিতে নারীর গৃহস্থালী কাজের অবদান শীর্ষক গবেষণায় দেখা যায়, গৃহিণীরা বিনামূল্যে যেসব গৃহস্থালী কাজ করে সেগুলোর আনুমানিক মূল্য বছরে ইউএস $২২৭.৯৩ বিলিয়ন থেকে $২৫৮.৮২ বিলিয়ন ডলার (ডাব্লিউবিবি ট্রাস্ট, ২০১৩)। শামীম হামিদ গবেষণায় হিসাব করে দেখান যে, যদি জাতীয় আয়ের সাথে নারীদের অন্যান্য কাজের সঙ্গে পারিশ্রমিক বিহীন কর্মকান্ডের অবদান যোগ করা হয় তাহলে জাতীয় অর্থনীতিতে নারীদের অবদান ২৫% থেকে বৃদ্ধি পাবে ৪১% পর্যন্ত। আর পুরুষদের অবদান ৭৫% থেকে দাঁড়ায় ৫৯%।  
 
গবেষণায় নারীদের দৈনন্দিন কাজ সম্পর্কিত বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। যেমন- নারীরা প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৬ ঘন্টা কাজ করে। সাংসারিক জীবনে অধিকাংশ নারীর কোন অবসর সময় নেই। তারা আয়মূলক বিভিন্ন কাজসহ গৃহস্থালীর অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে। এমনকি যারা অন্যের বাসায় গৃহপরিচালিকার কাজ অথবা চাকরি করে তারাও নিজের জন্য রান্না করে। অর্থাৎ কর্মস্থল থেকে ফিরে নিজের ঘরের প্রায় সব কাজ সম্পন্ন করেন। সাধারণভাবে শিশুদের লেখাপড়া, স্কুলের কাজ (হোমওয়ার্ক), চিকিৎসা, খাবারসহ বেশিরভাগ দায়িত্ব নারীরাই পালন করেন। শহরের তুলনায় গ্রামের নারীদের বেশ কিছু ভিন্ন ধরনের কাজ করতে হয় (ডাব্লিউবিবি ট্রাস্ট, ২০১৩)। 
 
স্যালারি ডট কম নামে একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান (ম্যাসাচুসেটস, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক) তাদের একটি গবেষণায় দেখান যে, মায়েরা পারিশ্রমিকবিহীন যে সকল কাজ করেন সেগুলোকে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে সম্পন্ন করতে হলে প্রত্যেক মাকে গড়ে বাৎসরিক ১,৩৪,১২১ (এক লাখ চৌত্রিশ হাজার একশত একুশ) ডলারের সমপরিমাণ বেতন দিতে হতো। এটি যুক্তরাষ্ট্রের একজন উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মালিক বা একজন বিচারকের বাৎসরিক আয়ের সমান। 
 
বাংলাদেশ হোম ওয়ার্কার্স উইমেন এ্যাসোসিয়েশন (বিএইচডাব্লিউএ) এর এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, গৃহপরিচালক বা গৃহপরিচালিকার কাজে নিয়োজিতরা প্রতিবছর জিডিপিতে প্রায় ১৫০ বিলিয়ন টাকা (ইউএস ডলার ২.৫৯ বিলিয়ন) পরিমাণ অবদান রাখছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই অবদান সরকারি পরিসংখ্যানে প্রতিফলিত হচ্ছে না। 
 
গৃহস্থালী কাজে নারীর মানবিক অবদানকে কোনভাবেই অর্থ দিয়ে পরিমাপ করা সম্ভব নয়। তবে বর্তমান ব্যবস্থায় গৃহস্থালী কাজের অবদানকে ব্যক্তি ও জাতীয় জীবনে সহজে তুলে ধরার লক্ষ্যে অর্থনৈতিক বিষয়টি গ্রহণযোগ্য। অর্থনীতিতে পুরুষের পাশাপাশি নারীদের অবদান অপরিসীম। গৃহস্থালী কাজের মাধ্যমে নারীরা পারিবারিক ক্ষেত্রেতো বটেই, আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে রাখছে অপরিসীম অবদান। জাতীয়ভাবে গৃহস্থালী এ অবদানকে তুলে ধরার প্রেক্ষিতে পরিবার ও সমাজে নারীর প্রতি শ্রদ্ধা বৃদ্ধি পাবে, পক্ষান্তরে যা সহিংসতা হ্রাসেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। রাষ্ট্রীয়ভাবে নারী উন্নয়নে কর্মসূচী গ্রহণ, অর্থায়নে সরকার ও নীতিনির্ধারকগণ আরো দায়িত্বশীল হবেন। 
 
জাতীয় অর্থনীতিতে নারীর অবদানের স্বীকৃতি প্রদানের বিষয়ে নীতিগত বিষয়ে বেশ কিছু অর্জন রয়েছে। জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি ২০১১ অর্থনীতিতে নারীদের তুলে ধরার লক্ষ্যে কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সংযুক্ত করা হয়েছে। যেমন: নারীর অংশগ্রহণ প্রাতিষ্ঠানিকরণের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে আর্থসামাজিক উন্নয়নে নারীর উন্নয়নে নারীর অবদান স্বীকৃতি, জাতীয় অর্থনীতিতে নারীর অবদান প্রতিফলনের জন্য বাংলাদেশ পরিসংখ্যান বুরে‌্যাসহ সকল প্রতিষ্ঠানে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, সকল জাতীয় হিসাব সমূহে, জাতীয় উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে কৃষি ও গৃহস্থ্য শ্রমসহ সকল নারী শ্রমের সঠিক প্রতিফলন ও মূল্যায়ন নিশ্চিত করা বিষয়গুলো অন্যতম।
 
নারীদের অবদান তুলে করার লক্ষ্যে, জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিতে নারীর অপ্রতিষ্ঠাতিক কাজেরএ স্বীকৃতি একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। তবে এ স্বীকৃতিকে বাস্তবায়ন করতে হবে। আর এ জন্য প্রয়োজন মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান বুরে‌্যা, অর্থ মন্ত্রণালয়সহ অন্যান্য সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ। গৃহস্থালী কাজে নারীদের ব্যপক অবদান জাতীয় অর্থনীতিতে সম্পৃক্ত করার বিষয়টি এখনো সকলের নিকট গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেনি।  এ বিষয়ে জনগনের মাঝে ব্যাপক জনসচেতনতা বৃদ্ধি প্রয়োজন। অর্থনীতিতে নারীর অবদান সম্পর্কে সঠিক সমাধানে পৌঁছাতে আরো বৃহত্তর পরিসরে গবেষণা হওয়াও জরুরি। সরকারী ও বেসরকারীভাবে কার্যকর সংস্থাগুলো সক্রিয়ভাবে এগিয়ে আসলে এ প্রচেষ্টা স্বার্থক ও সফল হবে।